বর্তমান সময়ের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গঠন ও ব্যবস্থাপনায় যে সমস্যা দেখা দিচ্ছে, তা শুধুই সাময়িক ধাক্কা নয় — এ যেন এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে দেশ নিজের ভবিষ্যৎ ভেঙে দিয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্প ও রফতানি-উপার্জন, নিরাপদ কাজ বা নতুন বিনিয়োগ— এগুলো যতই বড় করে অভিসিদ্ধ করা হোক না কেন, বাস্তবে যে ভিত্তি তৈরি হয়েছে, সেটি অত্যন্ত নাজুক ও নীতিগতভাবে ভঙ্গুর।
মূলত, আমাদের অর্থনীতিকে পরিচালনা করছে এক ধরনের অব্যাহত শোষণ ও মূল্যহীনতা — যেখানে প্রকৃত বাজার-অর্থনীতি বা স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা নয়, বরং ব্যক্তিগত এবং গোষ্ঠাগত সুযোগ, প্রশাসনিক দখল ও সুবিধাবাদকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। লেনদেন, লাইসেন্স, অনুমোদন, আমদানি-রফতানি, অগ্রাধিকারমূলক সত্যায়ন — এসব প্রক্রিয়া হয়ে উঠে অলাভজনক খরচ, কমিশন বা তারকার ওপর নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত। ফলে, শ্রমিকরা ও সাধারণ মানুষের ভাগ্য অনিরাপদ হয়, এবং প্রকৃত উৎপাদন ক্ষমতা বিকশিত হতে পারে না।
রফতানি-উপার্জন, বস্ত্রশিল্প, পোশাক কারখানা — এগুলো হয়তো দেশের অর্থনীতিকে সামান্য একটি রূপ দিয়েছে; কিন্তু এই রূপের পেছনে রয়েছে “প্রাকৃতিক সম্পদ, শ্রম ও পরিবেশ”র অব্যাহত শোষণ। কারখানা থেকে তৈরি পোশাক — চাহিদা বা লাভ যাই থাক, তার জন্য নিচ্ছে নদী, ভূগর্ভস্থ জল, মাটির উর্বরতা, এবং মানুষের শারীরিক স্বাস্থ্য। কারখানার বর্জ্য জল, রূপকর্তা রাসায়নিক দ্রবণ, নির্ধারিতভাবে নিষিদ্ধ হলেও অনেকে চালিয়ে যাচ্ছে; নিয়মিত পরিদর্শন ও পরিবেশ সুরক্ষার তেমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
ফলাফল স্পষ্ট: নদীপথ, নদীবন্দর, মণুষকৃত জল এবং মাটির উর্বরতা — সবই দ্রুত অবনতি করছে। সাময়িক অর্থ উপার্জন হয়, কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক পুঁজি ক্ষয় হয়। গিয়েছে জল, মাটি, নদী — হাতে শুধুই ক্ষুধা, রোগ, দূষণ, এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
তাছাড়া, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নয়, ন্যায্য বন্টনের দৃষ্টিকোণ থেকেও কর্পোরেট বিরাট ক্ষতি হচ্ছে। শ্রমিকরা তাদের কাজ অনুযায়ী বেতন পাচ্ছেন না; বাকি মুনাফা ও লাভ বড় গোষ্ঠীর হাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নতুন বিনিয়োগ বা উদ্ভাবনের জন্য পুঁজি থাকছে না; কারণ লাভের একটি বড় অংশ ফিরে যায় মধ্যস্থতার খরচ, অবৈধ কমিশন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুবিধা আদায়ে।
এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যেখানে “দক্ষতা, উদ্ভাবন বা ন্যায্য প্রতিযোগিতা” নয়, বরং “সংযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব বা বাণিজ্যিক লুকানো খরচ”ই গড়চুরি হয় — সেখানে অর্থনৈতিক গঠন সংকটাপন্ন হয়। কখনো GDP-এর হার বাড়াতে পারে, রফতানি-উপার্জন দেখাতে পারে; কিন্তু সেটা হবে কেবল এক ধরনের কায়দায় চালানো সংখ্যা। বাস্তব জীবনের কলকারখানা, পরিবেশ, মানুষের স্বাস্থ্য বা ভবিষ্যৎ— সবই এক ভয়াবহ ব্যালান্সহীনতায় ভুগবে।
এই কারণে বলা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন নিজের ভবিষ্যৎকে গিলে ফেলছে। কারণ — স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বা পরিবেশ-দায়িত্ব নেই; আছে শুধু আজকের মুনাফা, আজকের রফতানি, আজকের আর্থিক সুবিধা।
কি পরিবর্তন দরকার, ভবিষ্যৎকে ফিরিয়ে আনতে
যদি আমরা ভবিষ্যৎকে রক্ষা করতে চাই, তাহলে প্রথমেই প্রয়োজন — স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, লাইসেন্স, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ-নিয়ন্ত্রণ, শ্রমবিচার — এগুলোকে আইনগতভাবে শক্তিশালী এবং আচরণগতভাবে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করতে হবে।
শিল্প ও বাণিজ্য করপোরেট লভ্যাংশ নয়, প্রকৃত উৎপাদন ও পুনরায় বিনিয়োগের উপর টিকে থাকতে হবে। মুনাফারই চেয়ে বেশি, নতুন প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসম্মত কাজের পরিবেশ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সামাজিক দায়িত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে।
শ্রমিকদের শ্রেণি, বেতনের ন্যায্যতা, নিরাপদ কাজের পরিবেশ — এগুলো নিশ্চিত করতে হবে। যাতে তাদের শ্রম বিকৃত না হয়, এবং তারা নিজেকে মূল্যবান অংশ হিসেবে অনুভব করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ — আমাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় “দ্রুত লাভ” বা “শর্ট টার্ম রফতানি” নয়, “দীর্ঘমেয়াদী সচেতন, জবাবদিহিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন”-কে মুখ্য করতে হবে।
যৌথভাবে যদি সরকার, শিল্প, শ্রমিক, এবং নাগরিক — সবাই মিলে নতুন ভিত্তি গঠন করি; যেখানে মুনাফা, নিয়োগ, পরিবেশ ও সমাজ— সব বিষয়ই সমানভাবে বিবেচনায় থাকবে; তাহলে হয়তো আমরা আবার সেই অর্থনৈতিক গঠন ফিরে পাব, যা কেবল আজ নয়, আগামী প্রজন্মের জন্যও হবে সুরক্ষিত ও ন্যায্য।
