রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চার ভাই-বোনের অভাবনীয় সাফল্যের গল্প

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বাদশ সমাবর্তনের দিনটি ছিল এক অনন্য দৃশ্যের সাক্ষী। গাউন আর হ্যাট পরা হাজারো শিক্ষার্থীর ভিড়ে নজর কেড়েছেন চার ভাই-বোন, যারা অভাব আর কঠোর সংগ্রামের পাহাড় ডিঙিয়ে একই ক্যাম্পাস থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছেন। পুঠিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত ধোপাপাড়া গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক হারুন-অর রশিদের এই চার সন্তান হলেন— মো. আমানুল্লাহ (উর্দু বিভাগ), মো. ফিরোজুর রহমান (ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগ), মনিরা খাতুন (উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ) এবং মো. হুজ্জাতুল্লাহ (চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগ)।

দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াই ২০০৫ সালে যখন বড় ভাই আমানুল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, তখন তাদের বাবার বেতন ছিল মাত্র ৩ হাজার ১০০ টাকা। এই সামান্য আয়ে চার সন্তানের উচ্চশিক্ষা চালানো ছিল প্রায় অসম্ভব। পরিবারের খরচ জোগাতে দুই ভাইকে পড়াশোনার পাশাপাশি হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়েছে। তারা খেজুর গাছ কাটা, রস থেকে গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করা এবং ধান কাটা ও মাড়াইয়ের মতো কঠিন কাজও করেছেন হাসিমুখে। এমনকি খরচে লাগাম টানতে দুই ভাই একসঙ্গে হলে থাকার সুযোগ পাননি; একজন হলে থাকলে অন্যজনকে বাড়ি থেকে যাতায়াত করতে হতো। ছোট ভাই-বোনদের পড়ার খরচ বাঁচাতে বড় ভাইকে অনেক সময় নিজের শিক্ষাসফর বা আনন্দ ভ্রমণের শখ বিসর্জন দিতে হয়েছে।

সাফল্যের শিখরে উত্তরণ মাদ্রাসা শিক্ষা দিয়ে জীবন শুরু করলেও একে একে চারজনই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বড় ভাই আমানুল্লাহ ও মেজ ভাই ফিরোজুর রহমান বর্তমানে পিএইচডি ডিগ্রিধারী। ছোট বোন মনিরা ও ছোট ভাই হুজ্জাতুল্লাহও তাদের বড় ভাইদের দেখানো পথে মাস্টার্স শেষ করে উচ্চতর গবেষণার দিকে হাঁটছেন। মজার বিষয় হলো, এই পরিবারের নতুন সদস্যরাও (ছোট বোনের স্বামী ও মেজ ভাইয়ের স্ত্রী) একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং বর্তমানে তারা বিসিএস ক্যাডার হিসেবে কর্মরত।

সমাবর্তনে স্বপ্নের পূর্ণতা দীর্ঘ ২০ বছরের ত্যাগ ও সংগ্রামের ফসল হিসেবে এই সমাবর্তনের দিনটি ছিল তাদের জন্য স্বপ্নের মতো। তিন ভাই-বোন একসঙ্গে নাম নিবন্ধন করেছেন এবং একই রঙের পোশাকে নিজেদের সাফল্যের স্বীকৃতি উদযাপন করেছেন। ফিরোজুর রহমান বলেন, “অনেকেই বলতেন পিএইচডি করে কী হবে? কিন্তু আমরা সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলাম। আজকের এই আনন্দ ও গর্বের মুহূর্তগুলোর পেছনে মিশে আছে আমাদের বাবা-মায়ের রক্ত জল করা পরিশ্রমের গল্প।”

চার ভাই-বোনের এই অদম্য যাত্রার গল্প আজ অনেকের কাছেই প্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *