দৃঢ় মনোবল ও প্রচেষ্টা থাকলে কোনো বাধা পেরোনোই কঠিন নয়। দরকার ইচ্ছাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও কঠোর পরিশ্রম। আমাদের আশপাশে এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা সীমাবদ্ধতার মাঝেও নিজেদের জীবনগাথায় অদম্য জয় লিখে চলেছেন। তাদের সেই সাফল্য শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অর্জন নয়, সমাজের নানা প্রতিবন্ধকতাকেও চ্যালেঞ্জ করেছে।
বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামের আরলিন করিমের জীবন এমনই এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প। ছোটবেলায় তাঁর দাদুবাড়ি নদীভাঙনের শিকার হয়ে তলিয়ে যায়। মাত্র তিন দিনে দাদুবাড়ি, ধানখেত ও ফসলি জমি হারিয়ে শিশু আরলিন শিকড় থেকে ছিটকে পড়ার অনুভূতি পেলেন। জন্মভিটে হারানোর সেই অভিজ্ঞতা তাঁর শৈশবের এক দুঃসহ স্মৃতি হয়ে দাঁড়ায়।
পরবর্তীতে লেখাপড়ার জন্য খুলনা আসেন। ২০২৩ সালে তিনি ব্র্যাক ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মে যোগ দেন। সেখানে বিভিন্ন ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের শিকার অনেক তরুণ–তরুণীর সঙ্গে দেখা হয়। একসাথে তারা শুরু করেন ‘প্রজেক্ট উজ্জীবন’। প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জলবায়ু পরিবর্তন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতন করার উদ্যোগ নেয়া হয়।
শুরু হয় স্কুল ক্লাব কার্যক্রম। শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে পরিবেশ সচেতন করা হয়। স্কুলের আঙিনা পরিষ্কার, কাগজ–পাতা কুড়িয়ে পুনর্ব্যবহার ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চালানো হয়। এর পাশাপাশি ‘পরিবেশ মেলা’ আয়োজন করা হয়, যেখানে পরিবেশবান্ধব উপকরণ প্রদর্শন করা হয়। শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় এবং প্রকৃতির সুরক্ষায় নিজেদের দায়িত্ব বুঝতে শেখে।
তাঁর উদ্যোগ শুধু স্কুলেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বন্ধু বিতান’ নামে একটি পেজ খোলা হয়। এখানে পরিবেশ বিষয়ক তথ্য–উপাত্ত শেয়ার করা হয়। ২০২৪ সালে ‘আমরা নতুন নেটওয়ার্ক’ আয়োজিত কার্নিভ্যালে অংশ নিয়ে ‘চেঞ্জমেকার’ পুরস্কার অর্জন করা হয়। এই অর্জন আরলিন ও তার টিমকে আরও সাহস যোগায়।
এখন পর্যন্ত ১৫টি স্কুল ও বিভিন্ন সংগঠনকে যুক্ত করে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা প্রকৃতির রুদ্র চেহারা মোকাবিলার কৌশল শিখছে এবং পরিবেশ সুরক্ষায় সচেতন হচ্ছে। আরলিনের জীবনপ্রজ্ঞা প্রমাণ করে, নিজের জীবনের হতাশা ও অভিজ্ঞতাকেও আশায় রূপ দেওয়া সম্ভব, যদি ধৈর্য ধরে মনোবল রাখা যায়।
