তিন দেশের বন্ধন: মালি, নাইজার ও বুর্কিনা ফাসোর জোট কি সাহেল অঞ্চলের মানচিত্র বদলে দেবে?

আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। মালি, নাইজার এবং বুর্কিনা ফাসো—এই তিন দেশ মিলে গড়ে তুলেছে ‘অ্যালায়েন্স অব সাহেল স্টেটস’ (AES) বা সাহেল রাষ্ট্রসমূহের জোট। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর আল জাজিরায় প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে সাংবাদিক নিকোলাস হক এই জোটের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। পশ্চিম আফ্রিকার আঞ্চলিক জোট ইকোওয়াস (ECOWAS) থেকে বেরিয়ে আসার পর এই তিন সামরিক শাসিত দেশ এখন নিজেদের মধ্যে এক গভীর ও শক্তিশালী বন্ধন তৈরি করছে, যাকে বিশ্লেষকরা ‘তিন দেশের বিয়ে’ (A marriage of three) হিসেবে অভিহিত করছেন।

২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এই তিনটি দেশেই সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। মালির কর্নেল আসিনি গোইতা, বুর্কিনা ফাসোর ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ট্রাওরে এবং নাইজারের জেনারেল আবদুরাহমানে চিয়ানি—এই তিন নেতা এখন তাদের দেশগুলোকে এক সুতোয় বাঁধার চেষ্টা করছেন। তারা কেবল সামরিক সহায়তাই নয়, বরং একটি অভিন্ন অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলছেন। সম্প্রতি বামাকোতে আয়োজিত এক শীর্ষ সম্মেলনে তারা একটি নতুন বিনিয়োগ ব্যাংক, একটি নিজস্ব টেলিভিশন চ্যানেল এবং একটি যৌথ সামরিক বাহিনী গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের মূল লক্ষ্য হলো পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

এই জোট গঠনের পেছনে একটি বড় কারণ হলো ফ্রান্সের প্রতি ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ। কয়েক দশক ধরে সাহেল অঞ্চলে ফ্রান্সের যে সামরিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য ছিল, তা এখন এই দেশগুলো পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ফরাসি সেনাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়ার পর তারা রাশিয়ার সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করেছে। বিশেষ করে রাশিয়ার ভাড়াটে যোদ্ধা গোষ্ঠী ‘ভ্যাগনার’ এখন এই অঞ্চলে সশস্ত্র বিদ্রোহী দমনে কাজ করছে। এই দেশগুলোর নেতাদের মতে, ইকোওয়াস তাদের স্বার্থ রক্ষার চেয়ে বিদেশি শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়নে বেশি ব্যস্ত ছিল, তাই তারা নিজেদের বিকল্প পথ বেছে নিয়েছেন। তবে এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাঝেও সাহেল অঞ্চলে আল-কায়েদা এবং আইএস-এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতা ও বিস্তার থামেনি, যা সাধারণ মানুষের জন্য এখনো বড় উদ্বেগ।

জোটের নতুন টেলিভিশন চ্যানেলটির পরিচালক সালিফ সানোগো এই ইউনিয়নকে একটি ‘যুক্তিনির্ভর বিয়ে’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, ১৫টি দেশের জোট ইকোওয়াসের চেয়ে ৩টি দেশের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অনেক বেশি সহজ ও কার্যকর। এই জোট কেবল সীমান্ত সুরক্ষা নয়, বরং অভিন্ন মুদ্রা চালুর বিষয়েও আলোচনা করছে। তবে সমালোচকদের মতে, এই জোটের মাধ্যমে সামরিক শাসকরা তাদের ক্ষমতাকে আরও পোক্ত করছেন এবং দেশগুলোতে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মানবাধিকারের পথ সংকুচিত হচ্ছে। সব বাধা সত্ত্বেও, সাহেল অঞ্চলের এই তিন দেশের বন্ধন আফ্রিকার রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে, যা আগামী দিনে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *