২০২৫ সালের বিদায়লগ্নে দাঁড়িয়ে গাজার সাধারণ মানুষের জন্য নতুন বছর কোনো আনন্দ বা আশার বার্তা নিয়ে আসছে না, বরং তা নিয়ে আসছে এক চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক। আল জাজিরায় প্রকাশিত এক মর্মস্পর্শী নিবন্ধে ফিলিস্তিনি লেখক ও পদার্থবিদ কাসেম ওয়ালিদ জানিয়েছেন যে, যেখানে সারা বিশ্ব নতুন বছর উদযাপনে মত্ত, সেখানে গাজার মানুষ ভাবছে অনাগত দিনগুলোতে তাদের ভাগ্যে আর কী কী ভয়াবহতা অপেক্ষা করছে। বিগত বছরটি গাজাবাসীর জন্য ছিল এক অন্তহীন মৃত্যুমিছিল, ধ্বংসযজ্ঞ এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের চরম উদাসীনতার এক জীবন্ত দলিল। লেখকের মতে, ইসরায়েলি বাহিনীর ‘হত্যা যন্ত্র’ এবং বিশ্ববাসীর ক্রমবর্ধমান নির্লিপ্ততার মাঝে গাজার সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে।
বিগত বছরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কাসেম ওয়ালিদ উল্লেখ করেছেন যে, ২০২৫ সালটি ছিল নিষ্ঠুরতার এক নতুন উচ্চতা। বছরের শুরুতে সংক্ষিপ্ত এক যুদ্ধবিরতির পর যখন পুনরায় হামলা শুরু হয়, তখন পরিস্থিতি আগের চেয়েও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। লেখক তার নিজের চোখে দেখেছেন কীভাবে অনাহারে থাকা মানুষগুলো সাহায্যের জন্য একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এপ্রিল মাসে গাজায় প্রথম গণ-দুর্ভিক্ষের লক্ষণ দেখা দেয় এবং আগস্ট নাগাদ তা চরম রূপ নেয়। লেখক জানিয়েছেন, এক টুকরো রুটির জন্য মানুষকে লাল ডাল বা পাখির খাবার পিষে আটা বানাতে হয়েছে। মে মাসে লেখক সপরিবারে তার নিজের ঘর থেকে বাস্তুচ্যুত হন এবং জুলাই মাসে ইসরায়েলি বাহিনী তার পুরো পাড়াটি মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়।
নিবন্ধটিতে গাজার মানবিক পরিস্থিতির যে করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে, তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। নভেম্বরে শীতের প্রকোপ বাড়ার সাথে সাথে তাবুগুলো বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় এবং তীব্র ঠাণ্ডায় শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে থাকে। লেখক এই সময়টিকে ‘শয়তানি বা অপশক্তির চরম প্রকাশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, গাজার মানুষের জন্য এখন আর আশা বলে কিছু অবশিষ্ট নেই; তারা কেবল এক প্রকার অসহায়ত্ব এবং ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বেঁচে আছে। সেখানে বর্তমান, অতীত এবং ভবিষ্যৎ যেন একই বৃত্তে বন্দি হয়ে গেছে, যেখানে কেবল ধ্বংস আর যন্ত্রণার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে।
নতুন বছরে বিশ্ববাসী যখন নতুন নতুন সংকল্প গ্রহণ করছে, গাজার মানুষের সেই বিলাসিতা করারও সুযোগ নেই। লেখক আক্ষেপ করে বলেছেন যে, তিনি হয়তো চিনি কম খাওয়ার বা সাঁতার শেখার সংকল্প করতে পারতেন, কিন্তু ইসরায়েলি অবরোধ এবং হামলার কারণে তার জীবনের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সমুদ্রের পাড়ে গেলে তাকে গুলি করা হতে পারে অথবা খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে তাকে অনাহারে রাখা হতে পারে। তাই এই মুহূর্তে তার একমাত্র ‘নিউ ইয়ার রেজোলিউশন’ বা নতুন বছরের সংকল্প হলো—ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করার অভ্যাস করা, কারণ গ্যাস বা জ্বালানি কাঠের অভাবে গরম পানি পাওয়া এখন অসম্ভব। গাজার মানুষের জন্য নতুন বছর মানে কেবল আরেকটি ক্যালেন্ডারের পাতা পরিবর্তন, যেখানে প্রতিটি দিনই টিকে থাকার এক নতুন যুদ্ধ।
