সৌদি-আরব আমিরাত দ্বন্দ্ব এবং ইয়েমেনের স্বীকৃত সরকারের ওপর এর প্রভাব

ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মুকাল্লা বন্দরে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক বিমান হামলাকে কেন্দ্র করে দেশটির দীর্ঘদিনের দুই মিত্র সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এই ঘটনাটি কেবল দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটায়নি, বরং ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের স্থায়িত্বের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর আল জাজিরায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে বিশ্লষক খালেদ আল-হাম্মাদি উল্লেখ করেছেন যে, এই দ্বন্দ্ব ইয়েমেনকে এক নতুন গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা দেশটিকে আরও খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলবে।

দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয় যখন সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানান যে, সৌদি আরব বা ইয়েমেন সরকারকে না জানিয়েই দুটি জাহাজ মুকাল্লা বন্দরে প্রবেশ করেছিল। জাহাজগুলোতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছিল, যা সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি)-এর জন্য পাঠানো হয়েছিল। এর প্রেক্ষিতে সৌদি বিমানবাহিনী বন্দরে হামলা চালিয়ে সেই অস্ত্রের চালান ধ্বংস করে দেয়। সৌদি আরব মনে করে, হাজরামাউত এবং আল-মাহরার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলোতে এসটিসি-র প্রভাব বিস্তার তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি, কারণ এই অঞ্চলগুলো সৌদি সীমান্তের খুব কাছে এবং এখানে গুরুত্বপূর্ণ তেল-গ্যাস সম্পদ রয়েছে।

এই উত্তেজনার ফলে ইয়েমেনের আট সদস্যের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (পিএলসি) স্পষ্টভাবে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট রশাদ আল-আলিমি আমিরাতি বাহিনীকে ইয়েমেন ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাকে কাউন্সিলের একটি অংশ সমর্থন করলেও এসটিসি নেতা আইদারুস আল-জুবাইদির নেতৃত্বাধীন অপর অংশটি তীব্র বিরোধিতা করেছে। এর মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ইয়েমেনের স্বীকৃত সরকার এখন মূলত সৌদি আরব এবং আমিরাতের ছায়াযুদ্ধের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ক্ষমতার এই লড়াই ইয়েমেনি নেতাদের নিজেদের দেশের স্বার্থের চেয়ে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থ রক্ষায় বেশি মনোযোগী করে তুলেছে।

বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন যে, সৌদি এবং আমিরাতের এই বিবাদ উত্তর ইয়েমেনে আধিপত্য বিস্তারকারী হুতি বিদ্রোহীদের জন্য বড় ধরনের সুযোগ তৈরি করে দেবে। হুতিদের দমনের জন্য যে আরব জোট গঠিত হয়েছিল, তা এখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত। এর ফলে হুতিরা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার বাইরেও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে এবং ইয়েমেনের বৈধ সরকার আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। ইয়েমেনের রাজনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যা গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধকে আরও জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *