২০২৬ সালের শুরুতে দাঁড়িয়ে বিশ্বের শিশুদের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এক গভীর উদ্বেগ ও আশঙ্কার চিত্র ফুটে উঠেছে। সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী ইনগার অ্যাশিং আল জাজিরায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বর্তমান বিশ্বের শিশুরা। একদিকে যুদ্ধ, সংঘাত ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যদিকে মানবিক সহায়তা ব্যবস্থার চরম সংকট শিশুদের ভবিষ্যৎকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে বৈদেশিক সহায়তার ব্যাপক কাটছাঁট শিশুদের জীবন রক্ষাকারী কর্মসূচিগুলোকে স্থবির করে দিয়েছে, যা এই নতুন বছরে এক বিশাল মানবিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
নিবন্ধটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের হঠাৎ বৈদেশিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তে রাতারাতি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের তহবিল উধাও হয়ে যায়। এর ফলে লাখ লাখ শিশু খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তাদের ১০৬ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে অসংখ্য কান্ট্রি অফিস বন্ধ করা এবং হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই। তথ্যমতে, এই সহায়তা হ্রাসের ফলে প্রায় ৬৭ লাখ শিশু সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সংকট প্রমাণ করেছে যে, যখন মানবিক সহায়তা কেবল হাতেগোনা কয়েকটি দাতা দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা শিশুদের জীবনকে কতটা বিপন্ন করে তুলতে পারে।
গাজার বর্তমান পরিস্থিতিকে শিশুদের জন্য এক জীবন্ত নরক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের নিচে দাঁড়িয়ে সেখানকার শিশুরা অপুষ্টি ও চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ইনগার অ্যাশিং তার অভিজ্ঞতায় জানিয়েছেন যে, গাজার অনেক শিশু এখন বাঁচার চেয়ে মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করছে যাতে তারা পরলোকে তাদের বাবা-মায়ের সাথে মিলিত হতে পারে। এটি কেবল গাজার চিত্র নয়; বর্তমানে বিশ্বের প্রতি পাঁচটি শিশুর মধ্যে একজন সক্রিয় যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে বসবাস করছে। এই পরিসংখ্যানগুলো শিশুদের সুরক্ষায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের সম্মিলিত ব্যর্থতাকেই বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
তবে এই সংকটের মাঝেও ২০২৬ সালকে একটি পরিবর্তনের বছর হিসেবে দেখার সুযোগ রয়েছে বলে নিবন্ধে আশা প্রকাশ করা হয়েছে। পুরনো ও ভঙ্গুর সহায়তা মডেলের পরিবর্তে একটি উদ্ভাবনী, স্থানীয় নেতৃত্বাধীন এবং টেকসই মানবিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। শিশুদের কেবল সাহায্যের গ্রহীতা হিসেবে নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ২০২৬ সালে বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে শিশুদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেন। যদি আমরা একটি স্থিতিশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারি, তবেই কেবল ইতিহাসের এই ব্যর্থতা মুছে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
