দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের বেদনাদায়ক ঔপনিবেশিক ইতিহাস এবং এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে এক অভিনব পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন ৬৫ বছর বয়সী অধিকারকর্মী ও ইতিহাসবিদ লুসি ক্যাম্পবেল। তিনি পর্যটকদের কেপটাউনের এমন সব ঐতিহাসিক স্থানে নিয়ে যান, যেখানে কয়েক শতাব্দী আগে দাসপ্রথা এবং স্থানীয়দের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল। ক্যাম্পবেল মনে করেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এগুলো কয়েক শ বছরের পুরনো ঔপনিবেশিক শাসনেরই ধারাবাহিকতা। তার মতে, কেপটাউনের প্রতিটি স্থাপত্য এবং মোড়ের পেছনে লুকিয়ে আছে আদিবাসী ‘খোই’ (Khoi) জনপদ এবং পাচার হয়ে আসা দাসদের বঞ্চনার ইতিহাস।
ক্যাম্পবেল তার ট্যুরে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের জানান যে, ১৬৫২ সালে ডাচদের আগমনের আগে থেকেই এখানে আদিবাসী গোষ্ঠীগুলো শান্তিতে বসবাস করত। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসকরা তাদের জমি ও গবাদি পশু কেড়ে নিয়ে তাদের বাস্তুচ্যুত করে। এই ‘গণহত্যা’ এবং উচ্ছেদের ক্ষত আজও কেপটাউনের সমাজে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। তিনি সমালোচনা করে বলেন যে, ২০০৮ সালে চার্চ স্কোয়ারে নির্মিত স্লেভ মেমোরিয়ালের মতো সরকারি স্মৃতিস্তম্ভগুলো কেপটাউন বিনির্মাণে দাসদের অবদান এবং আদিবাসীদের কষ্টের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ক্যাম্পবেলের ভাষায়, বর্তমানের ভূমি মালিকানা ব্যবস্থা এখনো শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘুদের হাতে কুক্ষিগত থাকা এবং মিশ্র বর্ণের কৃষি শ্রমিকদের উচ্ছেদ হওয়ার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে অতীতের সেই অন্ধকার সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
কেপটাউনের বিভিন্ন জাদুঘর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহে থাকা মানুষের দেহাবশেষ নিয়েও সরব হয়েছেন এই ইতিহাসবিদ। তিনি গবেষণায় দেখেছেন যে, ইউরোপীয় অনেক প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জাদুঘরে বর্ণবাদী আদর্শ প্রচারের উদ্দেশ্যে কৃষ্ণাঙ্গ ও আদিবাসীদের দেহাবশেষ রাখা হয়েছে। ক্যাম্পবেল প্রস্তাব করেছেন যে, এই জাদুঘরগুলোকে মূল শহর থেকে সরিয়ে ‘কেপ ফ্ল্যাটস’-এর মতো শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকায় নিয়ে যাওয়া উচিত, যেখানে আদিবাসী এবং দাসদের বংশধররা বাস করেন। এতে সাধারণ মানুষ তাদের প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারবে এবং বুঝতে পারবে যে তাদের বর্তমান দারিদ্র্য বা প্রান্তিকতা কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত এবং নিষ্ঠুর ইতিহাসের ফলাফল।
মেট্রোপলিটন এলাকার সেন্ট জর্জ মলে রাখা আদিবাসী নারী ‘ক্রোটোয়া’-এর নামফলকটি ক্যাম্পবেলের কাছে অত্যন্ত কৃত্রিম ও লোকদেখানো মনে হয়। ক্রোটোয়াকে কেপটাউনের মিশ্র-বর্ণের মানুষের আদি মাতা হিসেবে গণ্য করা হলেও সেখানে তার ঐতিহাসিক গুরুত্বকে সঠিক মর্যাদা দেওয়া হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। নেলসন ম্যান্ডেলার স্মৃতিবিজড়িত গ্র্যান্ড প্যারেড থেকে শুরু করে আধুনিক বাণিজ্যিক এলাকা—সর্বত্রই ক্যাম্পবেল ইতিহাসের সেই অমীমাংসিত অধ্যায়গুলো খুঁজে পান। তার এই নিরলস সংগ্রামের মূল লক্ষ্য হলো দক্ষিণ আফ্রিকার তরুণ প্রজন্মকে তাদের শেকড় সম্পর্কে সচেতন করা এবং ইতিহাসের মাধ্যমে বর্তমানের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলা।
