সোমালিল্যান্ডকে ইসরায়েলের স্বীকৃতি: সোমালিয়ার তীব্র নিন্দা ও ‘নগ্ন আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত

বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল সোমালিল্যান্ডকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার ঘটনাকে ‘নগ্ন আগ্রাসন’ এবং সোমালিয়ার সার্বভৌমত্বের ওপর ‘সুস্পষ্ট হামলা’ হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সোমালিয়া সরকার। রবিবার সোমালিয়ার পার্লামেন্টের এক জরুরি অধিবেশনে দেশটির প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মাহমুদ এই ঘোষণাটিকে ‘বাতিল ও অকার্যকর’ বলে ঘোষণা করেন।

ইসরায়েলি স্বীকৃতির প্রেক্ষাপট গত শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর ২০২৫) ইসরায়েল বিশ্বের প্রথম দেশ এবং জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে জানানো হয়, এই সিদ্ধান্তটি ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর চেতনায় নেওয়া হয়েছে। সোমালিল্যান্ড ১৯৯১ সালে সোমালিয়া থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। ইসরায়েলের এই পদক্ষেপকে সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আবদিরাহমান মোহাম্মদ আবদুল্লাহি একটি ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ এবং ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বের সূচনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

সোমালিয়ার প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ সোমালিয়ার প্রধানমন্ত্রী হামজা আবদি বারে আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের সনদের চরম লঙ্ঘন। সোমালিয়া সরকার মনে করছে, এই স্বীকৃতির পেছনে একটি গভীর ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্ত রয়েছে। সোমালিয়ার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দাবি, ইসরায়েল গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করে সোমালিল্যান্ডে পাঠানোর একটি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই স্বীকৃতি দিয়েছে। সোমালিয়া এই পদক্ষেপকে তাদের জাতীয় ঐক্য ও অখণ্ডতার ওপর একটি ‘পরিকল্পিত আক্রমণ’ বলে অভিহিত করেছে এবং ইসরায়েলকে এই স্বীকৃতি অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ব্যাকল্যাশ ইসরায়েলের এই একতরফা স্বীকৃতির বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে।

  • আফ্রিকান ইউনিয়ন (AU): এই সংস্থটি ইসরায়েলের পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এটি মহাদেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি ‘বিপজ্জনক নজির’ স্থাপন করবে।

  • আরব লীগ ও ওআইসি (OIC): সৌদি আরব, মিশর, কাতার, তুরস্ক, জর্ডান এবং কুয়েতসহ ২১টি দেশ যৌথ বিবৃতিতে এই স্বীকৃতির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। কাতার ইসরায়েলকে সোমালিল্যান্ডের পরিবর্তে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

  • ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও হামাস: ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে আরব ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছে। হামাস অভিযোগ করেছে যে, ইসরায়েল গাজার মানুষকে সোমালিল্যান্ডে নির্বাসিত করার জন্য এই ‘মিথ্যা বৈধতা’ খুঁজছে।

কৌশলগত গুরুত্ব ও শঙ্কা বিশ্লেষকদের মতে, লোহিত সাগর এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালীর কাছাকাছি সোমালিল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েল সেখানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে আগ্রহী, যা ইয়েমেনের হুথিদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে। তবে সোমালিয়া সতর্ক করেছে যে, এই অস্থিতিশীলতা আল-শাবাবের মতো উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোকে রাজনৈতিক অস্থিরতা কাজে লাগানোর সুযোগ করে দেবে। বর্তমানে সোমালিয়া সরকার এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে এবং আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *