মিথ্যা বসন্ত: তিউনিসিয়ার বিপ্লবী স্বপ্নের অবসান?

২০১১ সালে তিউনিসিয়ায় শুরু হওয়া গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতন ঘটায়নি, বরং মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা জুড়ে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সাধারণ মানুষের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া সেই বিপ্লবকে অনেকেই একটি নতুন ভোর, একটি বসন্তের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। কিন্তু প্রায় দেড় দশক পর এসে সেই বসন্ত কি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে—এ প্রশ্ন আজ তিউনিসিয়ার রাজনীতি ও সমাজে গভীরভাবে উচ্চারিত হচ্ছে।

বিপ্লবের পর প্রথম দিকে দেশটিতে রাজনৈতিক উন্মুক্ততা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা চোখে পড়ার মতো ছিল। নতুন সংবিধান প্রণয়ন, নির্বাচন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছিল। মনে করা হচ্ছিল, তিউনিসিয়া হয়তো আরব বিশ্বের মধ্যে একটি সফল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠবে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আশার জায়গা সংকুচিত হতে থাকে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব এবং দুর্নীতির অভিযোগ মানুষের হতাশা বাড়িয়ে দেয়। এসব সমস্যার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতা ধীরে ধীরে একটি কেন্দ্রে জমা হতে থাকে। রাষ্ট্র পরিচালনায় কঠোরতা বৃদ্ধি পায় এবং বিরোধী কণ্ঠস্বর দমনের অভিযোগ উঠে।

বর্তমানে তিউনিসিয়ায় বহু রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী নানা ধরনের মামলার মুখোমুখি হচ্ছেন। সমালোচনামূলক মত প্রকাশকে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। অনেকের মতে, বিপ্লব-পূর্ব সময়ের দমনমূলক পরিবেশ আবার নতুন রূপে ফিরে এসেছে।

একসময় যে জনগণ রাস্তায় নেমে নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য সোচ্চার হয়েছিল, আজ তাদের বড় অংশ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কমে গেছে, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিপ্লব যে গণমানুষের ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বাস্তবে পূরণ হয়নি—এমন ধারণা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে।

অন্যদিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা পক্ষের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের মতে, দেশের স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য কঠোর পদক্ষেপ জরুরি ছিল। তারা দাবি করেন, আগের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেশকে অচল করে ফেলেছিল এবং শক্ত হাতে শাসন ছাড়া বিকল্প ছিল না।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—স্থিতিশীলতার নামে যদি স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও মত প্রকাশের অধিকার সীমিত হয়, তবে সেই বিপ্লবের মূল্য কী ছিল? যে বিপ্লব মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল একটি মুক্ত ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রের, তা কি আজ শুধুই ইতিহাসের একটি অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে?

তিউনিসিয়ার বিপ্লব হয়তো সম্পূর্ণ মুছে যায়নি, কিন্তু তার প্রাণশক্তি স্পষ্টভাবে ক্ষীণ হয়ে এসেছে। সেই বসন্ত, যা একদিন নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, আজ অনেকের চোখে একটি মিথ্যা বসন্ত—যার রেশ থেকে গেছে, কিন্তু রঙ ও উষ্ণতা হারিয়ে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *