‘আমরা ভয় পাই না’: চীনের বিশাল সামরিক মহড়ার মাঝেও তাইওয়ানে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা

তাইওয়ান প্রণালীতে চীনের বিশাল সামরিক মহড়া এবং আকাশসীমায় উত্তেজনার মাঝেও তাইওয়ানের সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে তার কোনো বিশেষ প্রভাব পড়েনি। ২০২৬ সালের শুরুতেই চীন যখন তাইওয়ানের উপকূলে ‘জাস্টিস মিশন ২০২৫’ নামক সরাসরি গুলি বর্ষণ এবং সামরিক অবরোধের মহড়া চালাচ্ছে, তখন দ্বীপ রাষ্ট্রটির নাগরিকরা তাদের দৈনন্দিন কাজকর্মে অবিচল রয়েছেন। আল জাজিরার একটি বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, তাইওয়ানের মানুষ দশকের পর দশক ধরে চীনের এই শক্তির প্রদর্শনী দেখে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছেন যে, যুদ্ধের হুমকি এখন তাদের কাছে জীবনের একটি সাধারণ অংশে পরিণত হয়েছে। সত্তর বছর বয়সী লিয়াও-এর মতো অনেক প্রবীণ নাগরিক মনে করেন, ভয় পেয়ে ঘরে বসে থাকার চেয়ে বন্ধুদের সাথে মাহজং খেলা বা শেয়ার বাজারের দিকে নজর রাখাই অনেক বেশি বাস্তবসম্মত।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে, তাইওয়ানকে যুক্তরাষ্ট্রের ১১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সহায়তা এবং তাইওয়ানিজ প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাই-এর প্রশাসনের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদেই এই মহড়া চালানো হচ্ছে। চীন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে তারা প্রয়োজন হলে বল প্রয়োগ করে তাইওয়ানকে মূল ভূখণ্ডের সাথে একীভূত করবে। তবে তাইওয়ানের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই হুমকির প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন ভাবে দেখা যাচ্ছে। নিউ তাইপেই সিটির অনেক কর্মজীবী মানুষ জানিয়েছেন যে, জীবনধারণের জন্য তাদের কাজে এতটাই ব্যস্ত থাকতে হয় যে যুদ্ধের খবর নিয়ে পড়ে থাকার মতো সময় তাদের হাতে নেই। অনেক নাগরিক আবার তাইওয়ানের শক্তিশালী অর্থনীতি এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বা টিএসএমসি-কে একটি ‘সিলিকন শিল্ড’ বা সুরক্ষাকবচ হিসেবে দেখেন, যা চীনকে সরাসরি আক্রমণে বাধা দেবে বলে তাদের বিশ্বাস।

তবে সবার মনে যে কোনো উদ্বেগ নেই, তা কিন্তু নয়। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের এক জরিপ বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানিজদের মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা কিছুটা বেড়েছে। বিশেষ করে ১৯ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ওয়াং-এর মতো তরুণ প্রজন্মের অনেকে এই সামরিক তৎপরতাকে আগের চেয়ে বেশি বাস্তবসম্মত এবং সিরিয়াস হিসেবে দেখছেন। ওয়াং জানান, পরিস্থিতি এখন এতটাই গম্ভীর মনে হচ্ছে যে মাঝে মাঝে তার উইল (ইচ্ছাপত্র) লিখে রাখতে ইচ্ছে করে। একদিকে চীনের মহড়া আর অন্যদিকে সম্প্রতি তাইওয়ানে ঘটে যাওয়া শক্তিশালী ভূমিকম্প এবং কিছু বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা তরুণদের মনে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করছে। তা সত্ত্বেও, তাইওয়ানের রাজপথ, বাজার এবং রেস্তোরাঁগুলোতে মানুষের উপস্থিতি ছিল আগের মতোই স্বাভাবিক।

তাইওয়ানের রাজনীতিতেও এই উত্তেজনার বড় প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (ডিপিপি) তাইওয়ানের স্বতন্ত্র পরিচয় ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে কথা বললেও প্রধান বিরোধী দল কুওমিনতাং (কেএমটি) চীনের সাথে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনে আগ্রহী। রাজনৈতিক এই মতভেদ সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের ওপরও প্রভাব ফেলছে। অনেকে মনে করছেন, সাধারণ নাগরিক হিসেবে ভোট দেওয়া ছাড়া তাদের আর কিছুই করার নেই, তাই পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়াই এখন তাদের একমাত্র পথ। সব মিলিয়ে চীনের এই বিশাল সামরিক মহড়া তাইওয়ানের আকাশ ও সমুদ্রে যুদ্ধের দামামা বাজালেও, দেশটির জনগণের অদম্য মনোবল এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের অভ্যস্ততা প্রমাণ করছে যে তারা এই ক্রমাগত হুমকিতে দমে যেতে রাজি নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *