একুশ শতকের প্রথম ২৫ বছর বা এক চতুর্থাংশ শতাব্দী শেষ হতে চলেছে এবং এই সময়ের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, পুরো বিশ্ব মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উগ্রপন্থা ও ধ্বংসাত্মক নীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। আল জাজিরায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে কলামিস্ট বেলেন ফার্নান্দেজ উল্লেখ করেছেন যে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর জর্জ ডব্লিউ বুশের হাত ধরে শুরু হওয়া ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ (War on Terror) আদতে বিশ্বজুড়ে বিশৃঙ্খলা, মৃত্যু এবং ধ্বংসের এক কালো অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সভ্যতাকে বাঁচানোর নামে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং বহু দেশ ও জনপদকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।
নিবন্ধটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বুশ প্রশাসনের সময় আফগানিস্তান ও ইরাক আক্রমণের মাধ্যমে যে ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল, তা পরবর্তী ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় প্রশাসনের আমলেই অব্যাহত ছিল। বুশের উত্তরসূরি হিসেবে শান্তিতে নোবেল জয়ী বারাক ওবামা তার মেয়াদের শেষ বছরেই বিশ্বের সাতটি দেশে ২৬ হাজারেরও বেশি বোমা নিক্ষেপ করেছেন। বিশেষ করে ইয়েমেনে ওবামার ড্রোন হামলা এবং বিয়ের অনুষ্ঠানে নিরপরাধ বেসামরিক মানুষকে হত্যার ঘটনাগুলো মার্কিন সামরিক নীতির নিষ্ঠুরতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে। পরবর্তীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে এই হামলার গতি আরও বাড়িয়ে দেন এবং সামরিক বাহিনীকে হোয়াইট হাউসের অনুমোদন ছাড়াই হামলা চালানোর একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রদান করেন।
জো বাইডেনের আমলেও এই নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং তার প্রশাসন ইসরায়েলকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দিয়ে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় একটি সর্বাত্মক গণহত্যা পরিচালনায় সরাসরি মদত দিয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নাম দিয়ে ইসরায়েল গাজার সাধারণ মানুষের ওপর যে নৃশংসতা চালিয়েছে, তাকে মার্কিন করদাতার অর্থ দিয়ে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন সামরিক তান্ডব আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ভেনিজুয়েলার জলসীমায় সাধারণ মানুষের ওপর হামলা এবং নির্বিচারে বোমা বর্ষণের ঘটনাগুলো এখন কোনো আইনি মোড়ক ছাড়াই সরাসরি সাম্রাজ্যবাদী মেজাজে পরিচালিত হচ্ছে।
বেলেন ফার্নান্দেজ তার লেখায় স্পষ্ট করেছেন যে, বুশ থেকে ট্রাম্প—প্রত্যেক মার্কিন প্রেসিডেন্টই কম-বেশি একই ধ্বংসাত্মক পথ অনুসরণ করেছেন। আগে যেখানে হামলার পেছনে অন্তত একটি কৃত্রিম আইনি যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হতো, এখন ট্রাম্পের আমলে সেই রাখঢাকও নেই। ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে ‘নার্কো-টেররিজম’ বা তেল চুরির ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে যে হামলা চালানো হচ্ছে, তা মূলত মার্কিন সামরিক শক্তির এক নজিরবিহীন ও বিশৃঙ্খল আস্ফালন। একুশ শতকের এই প্রথম ২৫ বছর ইতিহাসের পাতায় কেবল মার্কিন সামরিকবাদের বিপর্যয়কর উত্তরাধিকার হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে, যা অগণিত মানুষের কান্না আর রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
