খালেদা জিয়ার প্রয়াণ ও নির্বাচনের আগে বিএনপির জন্য এক কঠিন পরীক্ষা

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু দেশের রাজনীতিতে একটি যুগের অবসান ঘটিয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনের ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগে তার এই চলে যাওয়া দলটির জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কয়েক দশকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে খালেদা জিয়া কেবল বিএনপির প্রধান নেতা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন দলটির ঐক্য ও শক্তির প্রধান প্রতীক। বিশ্লেষকদের মতে, তার অনুপস্থিতিতে এখন দলটির সম্পূর্ণ দায়ভার এবং নেতৃত্বের পরীক্ষা দিতে হবে তার পুত্র ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে।

২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ভোরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন খালেদা জিয়া। তার মৃত্যুতে কেবল বিএনপি সমর্থকরাই নয়, বরং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। বুধবার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তার জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নামে, যা প্রমাণ করে অসুস্থতা এবং দীর্ঘ সময় রাজনীতির বাইরে থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা কতটা অটুট ছিল। আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং নব্বইয়ের দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ, যার আপসহীন নেতৃত্ব দলটিকে বারবার ক্ষমতায় এনেছে।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো খালেদা জিয়ার প্রতীকী নেতৃত্ব ছাড়াই নির্বাচনে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়া এবং শেখ হাসিনার ভারতে নির্বাসিত থাকার ফলে নির্বাচনী ময়দান এখন অনেকটা উন্মুক্ত হলেও, নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা মেটানো বিএনপির জন্য সহজ হবে না। তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস জীবন শেষে সম্প্রতি দেশে ফিরলেও, তার নেতৃত্বের ওপর দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখা এবং সাধারণ ভোটারদের আস্থা অর্জন করার গুরুদায়িত্ব এখন তারই কাঁধে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদের মতে, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দলটিকে যেভাবে আগলে রাখত, সেই ছন্দ এখন কিছুটা ব্যাহত হতে পারে।

নির্বাচনের আগে বিএনপিকে এখন কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং সুনির্দিষ্ট সংস্কার কর্মসূচি এবং সুশাসনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এগোতে হবে। তারেক রহমান ইতিমধ্যে ৩১ দফার একটি সংস্কার এজেন্ডা ঘোষণা করেছেন, যেখানে ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার কথা বলা হয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণে নিজেদের প্রধান শক্তি হিসেবে প্রমাণ করা হবে দলটির জন্য এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা। খালেদা জিয়ার প্রয়াণ কেবল একটি শূন্যতাই তৈরি করেনি, বরং এটি বিএনপিকে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যেখানে তাদের ভবিষ্যৎ সাফল্য নির্ভর করবে খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকারকে তারা কতটা কার্যকরভাবে সামনে এগিয়ে নিতে পারে তার ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *