গৃহযুদ্ধ ও নির্বাচনের তোড়জোড়: মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতির চিত্র

মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে চলমান গৃহযুদ্ধ এখন এক চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। একদিকে জান্তা সরকার ২০২৫ সালে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করছে, অন্যদিকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সমন্বিত হামলায় সেনাবাহিনী একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ও সীমান্ত চৌকির নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে মিয়ানমারের এই জটিল সংকটের বর্তমান চিত্র ফুটে উঠেছে।

জান্তার নির্বাচন পরিকল্পনা ও চ্যালেঞ্জ মিয়ানমারের সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং দেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেই ২০২৫ সালে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। সেনাবাহিনী এই নির্বাচনকে তাদের ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি বৈধ পথ হিসেবে দেখালেও জাতিসংঘ এবং অধিকাংশ পশ্চিমা দেশ একে ‘প্রহসন’ বলে অভিহিত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চল এখন বিদ্রোহীদের দখলে থাকায় একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রায় অসম্ভব। জান্তা সরকার ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার জন্য সেনসাস বা জনশুমারি শুরু করলেও অনেক এলাকায় সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সাফল্য ও ‘অপারেশন ১০২৭’ গত বছরের শেষদিকে শুরু হওয়া ‘অপারেশন ১০২৭’-এর দ্বিতীয় পর্যায় জান্তা বাহিনীকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছে। ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সসহ (থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স) বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো শান রাজ্য এবং রাখাইন রাজ্যের বিশাল এলাকা দখল করে নিয়েছে। বিশেষ করে চীনের সীমান্তবর্তী বাণিজ্য পথগুলো এবং গুরুত্বপূর্ণ শহর লশিয়ো এখন বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পাশাপাশি গণতন্ত্রকামী পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস (পিডিএফ) এখন সরাসরি জান্তার শক্তঘাঁটিগুলোতে হানা দিচ্ছে।

মানবিক সংকট ও শরণার্থী পরিস্থিতি টানা তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে মিয়ানমারের সাধারণ মানুষ চরম মানবিক সংকটে পড়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা এখন ৩০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। জান্তা বাহিনী বিদ্রোহীদের দমনে নির্বিচারে বিমান হামলা ও ভারী অস্ত্র ব্যবহার করায় সাধারণ মানুষের প্রাণহানি বাড়ছে। এছাড়া রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যবর্তী লড়াইয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী পুনরায় জাতিগত নিধনের মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অবস্থান ও ভূ-রাজনীতি মিয়ানমার সংকটে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে বিদ্রোহীদের সাথে জান্তার মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও বর্তমানে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর অগ্রযাত্রায় তারা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে, আসিয়ান (ASEAN) সদস্য দেশগুলো তাদের ‘পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। জান্তা সরকার তাদের আন্তর্জাতিক একাকীত্ব কাটাতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে, তবে বিদ্রোহীদের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা মিয়ানমারের ভবিষ্যৎকে এক অনিশ্চিত পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *