প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলে কথিত মাদক পাচারকারী নৌকায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাম্প্রতিক হামলার পর নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে চালানো উদ্ধার অভিযান স্থগিত ঘোষণা করেছে মার্কিন কোস্ট গার্ড। ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, মেক্সিকো ও গুয়াতেমালা সীমান্তের দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ৭৪০ কিলোমিটার এলাকায় টানা তিন দিন ধরে ৬৫ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তল্লাশি চালানো হলেও কোনো জীবিত মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়নি। বৈরী আবহাওয়া, উত্তাল সমুদ্র এবং তীব্র বাতাসের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত এই অভিযান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাউদার্ন কমান্ডের তথ্যমতে, গত মঙ্গলবার প্রশান্ত মহাসাগরে তিনটি নৌকার একটি বহরের ওপর হামলা চালানো হয়। একটি নৌকায় থাকা তিন ব্যক্তি ঘটনাস্থলেই নিহত হন, তবে অন্য নৌকাগুলোর যাত্রীরা সাগরে ঝাঁপ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে সামরিক বাহিনী সেই নৌকাগুলোকেও ডুবিয়ে দেয়। এছাড়া অন্য একটি পৃথক হামলায় আরও দুই ব্যক্তির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাস থেকে এ পর্যন্ত মোট ৩৩টি নৌকায় এ ধরনের হামলা চালানো হয়েছে, যাতে অন্তত ১১৫ জন নিহত হয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব হামলাকে মাদক-সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে বর্ণনা করা হলেও কোনো হামলার ক্ষেত্রেই মাদক উদ্ধারের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেওয়া হয়নি।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই কার্যক্রমকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, কোনো আইনি প্রক্রিয়া বা বিচার ছাড়াই এভাবে মাঝসমুদ্রে নৌকা ডুবিয়ে দেওয়া এবং মানুষ হত্যা করা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। বিশেষ করে গত সেপ্টেম্বর মাসে ক্যারিবীয় সাগরে একটি হামলার পর জীবিতদের ওপর পুনরায় হামলার যে অভিযোগ উঠেছে, তা যুদ্ধের রীতিনীতি এবং সামরিক নীতিমালার বিরোধী। ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য দাবি করেছে যে, তারা তথাকথিত ‘নার্কো-টেররিস্ট’ বা মাদক-সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে এই অভিযান চালাচ্ছে যারা আমেরিকাকে অস্থিতিশীল করতে চায়।
ভেনিজুয়েলার ওপর ক্রমবর্ধমান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং দেশটির ওপর সামরিক চাপ সৃষ্টির ধারাবাহিকতায় এই জলপথে নজরদারি ও হামলা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো অভিযোগ করেছেন যে, আমেরিকা তার সরকারকে উৎখাত করতে এবং দেশটির বিশাল তেল সম্পদ দখল করতেই এসব অজুহাতে সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে। তবে সাম্প্রতিক উত্তেজনার মাঝে মাদুরো কিছুটা নমনীয় সুর অবলম্বন করে মাদক পাচার রোধে আমেরিকার সাথে আলোচনার প্রস্তাবও দিয়েছেন। প্রশান্ত মহাসাগরের এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন ভেনিজুয়েলায় মার্কিন হামলা এবং মাদুরোকে বন্দি করার খবরে পুরো বিশ্ব তোলপাড় হচ্ছে। উদ্ধার অভিযান স্থগিত হওয়ার ফলে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া ব্যক্তিদের ভাগ্য এখন চিরতরে অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।
